খাদিমনগর-জাতীয়-উদ্যান

গহীন জঙ্গল ও পাহাড় ভেদ করে নেমে আসা ঝর্নাধারার উপর শেষ বিকেলের রোদের ঝিলিক যেন এক মায়াবী পরিবেশ। অবশ্য গহীন বনের ভিতর আঁকা বাঁকা পথ কেবল সামনের দিকে টানলেও বন বনানীর ভিতরের সরীসৃপ ও বন্য প্রাণীর অবস্থান যেকোন আগন্তুকের মনের কোণে ভয় পাইয়ে দেবে। হঠাৎ যদি সামনে পড়ে যায় চন্দ গোরা বা অলগোরা অজগর সাপ কিংবা বিষাক্ত গোখরা তখন ঘাম ঝেড়ে শীতল হয়ে যাবে শরীর। হনুমানের বিচরণ এবং বানরের দৌড়ঝাঁপ বা ফাজলামি বেশ মজা পাইয়ে দিবে। বনকর্মীসহ সংশিস্নষ্টরা এ এলাকায় দিনে রাতে অনেকটা নির্বিঘ্নেই চলাচল করে থাকেন অভ্যাসের কারণে। এই পরিবেশের সাথে তারা সহঅবস্থানে আছেন।

“দেখা হয়নি চক্ষু মেলিয়া ঘর হতে শুধু দু’পা ফেলিয়া, একটি ধানের শীষের উপর একটি শিশির বিন্দু”-কবিতার এই পংতিগুলো মনে করিয়ে দেবে খাদিম জাতীয় উদ্যান দেখতে গেলে। খোদ সিলেট শহরের অনেকেই জানেন না জীববৈচিত্র্যের আঁধার খাদিম ফরেস্টের কথা। শহরের পূর্বদিকে জাফলং যাওয়ার পথে ১৫ কি.মি. দূরে ৬৭৮ হেক্টরের বিশাল বনভূমিকে ২০০৬ সালে খাদিম নগর জাতীয় উদ্যান হিসেবে সরকারীভাবে ঘোষিত হয়েছে। সিলেটের বনবিভাগ এটির রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে রয়েছে।

খাদিমনগর জাতীয় উদ্যান সিলেট শহর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে সিলেট সদর উপজেলার খাদিমনগর ইউনিয়ন ও গোয়াইনঘাট উপজেলার ফতেহপুর ইউনিয়নে অবস্থিত। ৬টি চা বাগান দ্বারা পরিবেষ্টিত উঁচু নীচু পাহাড়ী এলাকা বিশিষ্ট খাদিমনগর জাতীয় উদ্যানের মোট আয়তন ১৬৭৬.৭৩ একর। আকর্ষণীয় বেত-বাঁশসহ বিভিন্ন উদ্ভিদ এবং বিরল পশুপাখির আবাসস্থল খাদিমনগর জাতীয় উদ্যান ভ্রমণের জন্য অনন্য। খাদিমনগর জাতীয় উদ্যানের পূর্বে ছড়াগাং চা বাগান, জালালাবাদ সেনানিবাস এবং হাবিবনগর চা বাগান, পশ্চিমে বুরজান চা বাগান, কালাগুল চা বাগান, উত্তরে গুলনী চা বাগান এবং দক্ষিণে খাদিম চা বাগান।

জাফলং-সড়কের ১০ কি.মি. দূরে খাদিম চৌমুহনী। হাতের বায়ে মোড় নিলে পাকা রাস্তা। কিছু দূর গিয়ে খাদিম চা বাগান। ইট-পিচিং রাস্তার পর কাঁচা মেঠো পথ। স্থানে স্থানে কাঁদা। ৫ কি.মি. পর এই উদ্যান। তেমন কোন জাকজমক নেই চারদিকে। এখানে রয়েছে রেঞ্জ-১ এর খাদিম নগর বিট অফিস। টিলার উপর টিনশেড পাকা জরাজীর্ণ ২টি ঘর। একজন বিট কর্মকর্তা ও ৪ জন বননিরাপত্তা প্রহরী শত শত কোটি টাকার বিশাল এই বন প্রহরা-দিচ্ছেন- ভাবলে অবাক লাগে।

জীব বৈচিত্র্যে ভরপুর খাদিমনগর জাতীয় উদ্যানে প্রায় ২১৭ প্রজাতির গাছ এবং ৮৩ প্রজাতির প্রাণি রয়েছে। এ উদ্যানে সচরাচর যে সমস্ত প্রাণি দেখা যায় তাদের মধ্যে দোয়েল, ময়না, শ্যামা, কাক, কোকিল, টিয়া, কাঠঠোকরা, মাছরাঙ্গা, চিল, ঘুঘু, বক, টুনটুনি, চড়-ই, বুলবুলি, বনমোরগ, মথুরা, শালিক, বানর, হনুমান, শিয়াল, বনবিড়াল, বেজি, কাঠবিড়াল, ইঁদুর, খরগোস, মেছো বাঘ, বিভিন্ন ধরনের সাপ যেমন- অজগর, দারাইশ, উলুপুড়া, চন্দ বুড়া, ইত্যাদি বিষধর সাপ।

খাদিম জাতীয় উদ্যানের বেশিরভাগ ভূমিতে রয়েছে মূল্যবান বৃক্ষরাজি। সেগুন, ঢাকি জাম, গর্জন, চম্পা ফুল, চিকরাশি, চাপালিশ, মেহগিনি, শিমুল, চন্দন, জারুল, আম, জাম, কাউ, লটকন, বন বড়ই, জাওয়া, কাইমূলা, গুলিস্ন, পিতরাজ, বট, আমলকি, হরিতকি, বহেড়া, মান্দা, পারুয়া, মিনজিরি, অজর্ুন, একাশিয়া, বাঁশ (জাইবাশ, বেতুয়া বাঁশ, পেঁচা বাঁশ, পারুয়া বাঁশ) এবং বেত (তালস্নাবেত, জালিবেত) ইত্যাদি। গাছপালা, তরুলতা, বাঁশ-বেত পরিবেষ্টিত খাদিমনগর জাতীয় উদ্যানে জীববৈচিত্র্যের গুরুত্ব অপরিসীম। এখানে রয়েছে ৪০-৫৫ ফুট উঁচু ও ৫-৭ ফুট ব্যাসের মূল্যবান সেগুন গাছ।

ঢাকা থেকে ট্রেনে অথবা বাসে সিলেট যেতে সাড়ে ৬ ঘন্টা সময় প্রয়োজন।

পারাবত এক্সপ্রেস প্রতিদিন সকাল সাড়ে ৬টায় ঢাকার কম্লাপুর রেলস্টেশন থেকে ছাড়ে(সাপ্তাহিক বন্ধ মঙ্গলবার)। জয়ন্তিকা ছাড়ে প্রতিদিন বেলা ২টায়(স্পতাহিক বন্ধ নেই)। ভাড়া তাপানুকূল বার্থ ৬০০ টাকা, তাপানুকূল আসন ৪৫০ টাকা, প্রথম শ্রেণি বার্থ ৩৭০ টাকা, প্রথম শ্রেণি ২৭০ টাকা, শোভন ১৭০ টাকা।

সিলেট শহর থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরে তামাবিল-জাফলং রোডে খাদিমনগর জাতীয় উদ্যান। বাম পাশের পিচ ঢালা রাস্তা দিয়ে খাদিম চা বাগানের পথে কিছুদূর এগুলে চা বাগান ও কারখানা। চা কারখনা অতিক্রম করে সামনের দিকে পায়ে হেঁটে গেলেই পাওয়া যাবে খাদিমনগর জাতীয় উদ্যান।

সিলেট থেকে খাদিমনগরের দূরত্ব পর্যন্ত রিজার্ভ জিপে ভাড়া লাগে দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা।

খাদিমনগর থাকার কোন জায়গা নেই। তবে আশে পাশে নাজিমগড়, শুকতারার মত অনেক রিসোর্ট রয়েছে। এখানে থাকতে পারেন। কিংবা ভ্রমন শেষে সিলেট শহরে ফিরে এসে শহরেরই থাকতে পারেন।