কেন্দ্রীয়-শহীদ-মিনার

৫২-র ফেব্রুয়ারি মাসের শুরু থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ছাত্রসমাজ তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলে। সেদিন একুশে ফেব্রুয়ারি ছাত্ররা আমতলায় ঐতিহাসিক সমাবেশ শেষে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে রাজপথে মিছিল নিয়ে আসে। মিছিলটি ঢাকা মেডিকেল কলেজের উত্তর-পশ্চিম দিকের নিকট পৌছালে পুলিশ মিছিল লক্ষ্য করে গুলি করে। সেদিন রফিক,সালাম, বরকত, জব্বার প্রমুখ শহীদ হন। আহত হন আরও অনেকে।

একুশে ফেব্রুয়ারিতে শহীদদের স্মরণে ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্ররা সেই রক্তভেজা স্থানে একটি শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করার উদ্যোগ নেয়। এসময় মেডিকেল কলেজের ছাত্রাবাস সম্প্রসারণের কাজ চলছিল। কলেজের মধ্যেই ইট, বালি, রোড স্তুপাকারে ছিল। তালাবদ্ধ একটি গুদামে ছিল সিমান্ট। ঐ গিদামের চাবি ছিল পিয়ারু সর্দারের কাছে। ছাত্ররা পিয়ারু সর্দারের কাছে গিয়ে নিজেদের অভিপ্রায় জানায় এবং তার গুদামের সিমেন্ট ব্যবহারের অনুমতি প্রার্থনা করে। পিয়ারু ছাত্রদের কথা শুনে কালবিলম্ব না করে ঘরের ভেতর থেকে চাবি এনে ছাত্রদের হাতে দেন। বলেন, যত প্রয়োজন হয় সিমেন্ট ব্যবহার কর। আর সিমেন্ট নেয়া হলে গুদামে তালা মেরে চাবি ফেরত দিয়ে যেও। তিনি সেদিন শুধু সিমেন্ট ব্যবহার করার অনুমতি দেননি, দু’জন রাজমিস্ত্রিও দিয়েছিলেন ছাত্রদের সাহায্য করার জন্য এবং ছায়ার মত তাদের পাশে ছিলেন যাতে কেউ তাদের কোন ক্ষতি করতে না পারে। ২২শে ফেব্রুয়ারি এক রাতের শ্রমে মির্মাণ করা হয় ভাষা শহীদদের উদ্দেশ্যে দেশে প্রথম শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ।

ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্ররা ১৯৫২ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি রাতে ২১ ও ২২ তারিখে ভাষার দাবিতে শহীদদের স্মরণে যে শহীদ মিনার তৈরির কাজ শুরু করে তারকাজ শেষ হয় ২৪ ফেব্রুয়ারি ভোরে। শহীদ মিনারের খবরের কাগজে পাথানো হয় ঐ দিনই। শহীদ বীরের স্মৃতিতে এই শিরনামে দৈনিক আজাদ পত্রিকায় ছাপা হয় শহীদ মিনারের খবর।

মিনারের তৈরি হয় মেডিকেলের ছাত্র হোস্টেলের (ব্যারাক) বার নম্বর শেডের পূর্ব প্রান্তে। কোণাকুণভাবে হোস্টেলের মধ্যবর্তী রাস্তার গা-ঘেষে। উদ্দেশ্য বাইরের রাস্তা থেকে যেন সহজেই চোখে পড়ে এবং যে কোনো শেড থেকে বেরিয়ে এসে ভেতরের লম্বা টানা রাস্তাতে দাঁড়ালেই চোখে পড়ে। শহীদ মিনারটি ছিল ১০ফুট উচ্চ ও ৬ফুট চওড়া। মিনার তৈরির তদারকিতে ছিলেন জিএস শরফুদ্দিন (ইঞ্জিনিয়ার শরফুদ্দিন নামে পরিচিত), ডিজাইন করেছিলেন বদরুল আলম। সাথে ছিলেন সাঈদ হায়দার। ভোর হবার পর একটি কাপড় দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয় মিনারটি। ঐ দিনই অর্থাৎ ২৪ ফেব্রুয়ারি সকালে , ২২ ফেব্রুয়ারি শহীদ শফিউরের পিতা আনুষ্ঠানিকভাবে শহীদ মিনারের উদ্বোধন করেন। ২৬ ফেব্রুয়ারি সকাল দশটার দিকে শহিদ মিনারের উদ্বোধন করেন আজাদ সম্পাদক আবুল কালাম শামসুদ্দিন। উদ্বোধনের দিন ২৬ ফেব্রুয়ারি পুলিশ ও সেনাবাহিনী মেডিকেলের ছাত্র হোস্টেল ঘিরে ফেলে এবং প্রথম শহীদ মিনার ভেঙ্গে ফেলে। এরপর ঢাকা কলেজেও একটি শহীদ মিনার তৈরি করা হয় এটিও একসময় সরকারের নির্দেশে ভেঙ্গে ফেলা হয়।

অবশেষে, বাংলাকে পাকিস্থানের রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি দেবার পরে ১৯৫৭ সালে কেন্দীয় শহীদ মিনারের কাজ শুরু হয়। এর নির্মাণ কাজ শেষ হয় ১৯৬৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বে গঠিত কমিটির তত্ত্বাবধানে। এই শহীদ মিনার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি থেকে পূর্বদিকে, জগন্নাথ হলের দক্ষিণে ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এর উত্তরে অবস্থিত।