কালবন

পাতা ঝরারমাস বসন্ত। কোকিলের কুহু কুহু ডাক। আমের মুকুলের চোখ ধাঁধানো রং। শিমুলেররক্তরাঙা লাল ফুল। এই রূপ এখন উত্তরবঙ্গের জেলা দিনাজপুরের। দিনাজপুরেঐতিহাসিকতার ছোঁয়া তো আছেই। পাশাপাশি আছে ঘন সবুজ শালবন। সবুজ প্রকৃতিরমাঝে হারিয়ে যাওয়া_ অন্যরকম আনন্দ। কিন্তু এ সময়ে শালবনে চলে পাতা ঝরা।পাতাবিহীন শালবন আর শালবন থেকে নীল আকাশ দেখতে নাকি অন্যরকম লাগে। এসবভাবতেই মন হারিয়ে যায়। মনের আকুতি তখন হয় আকাশচুম্বী।

দিনাজপুর তথা উত্তবঙ্গের সবচাইতে বড় ন্যাচারল বন হল এটি। পুরো শালবনটিদেখে মনে হবে যেন কোন চিত্রশিল্পীর তুলির অাঁচড়ে অাঁকা ছবি। এখানে শুকনোপাতায় পা রাখতেই মরমর শব্দে শালবনের নীরবতা ভাঙে। গাছগুলোতে হরেক রকমেরপাখির আনাগোনা। কোকিল, টিয়া, সারস, ঘুঘু, ময়না আরও কত কি! তাদের আনন্দআড্ডায় মুখরিত চারপাশ। চারপাশ থেকে ভেসে আছে অদ্ভূত ধরনের শব্দ। মনে হবেযেন শব্দ করে কিছু একটা ধেয়ে আসছে। ভরকে যাবার কিছু নেই। এটি আসলে বাতাসেশালপাতা নড়ার শব্দ। প্রাকৃতিক নিয়মে শালবীজ পড়ে বন তৈরি হওয়ার কারণেই নাকিবনটিকে ন্যাচারাল শালবন বলা হয়।

শালবনটি প্রায় ২৮৬৭ একর এলাকাজুড়ে অবস্থিত। বনের মধ্যে শালগাছ ছাড়াওরয়েছে আমলকি, সর্পগন্ধা, বহেরা, হরতকি, চিরতাসহ নানা ধরনের ঔষুধি গাছ।ফরেস্টের একটি ছোট্ট রেস্ট হাউজ রয়েছে এখানে। রেস্ট হাউজ পেরিয়ে সামনেএগিয়ে গেলে যে বনটি তার নাম মিরা বন। বনের মধ্যদিয়ে খাল আকৃতির নোলা নদীচলে গেছে ভারতে। বনটিতে এক সময় মিলত বাঘসহ হিংস্র সব জানোয়ার। এখন সেসব নাথাকলেও শেয়াল, খরগোশ, বন মোরগ আর নানা ধরনের বিষাক্ত সাপ দেখা যায়হরহামেশাই। মিরাবনে ঢুকে আপনি হারিয়ে যাবেন অন্য রকম দৃশ্যের মাঝে। গোটাবনের একটি গাছেও পাতা নেই। পাতাবিহীন শালবনের ভেতর দিয়ে দেখা যাচ্ছে চমৎকারনীল আকাশ। সে এক অভাবনীয় দৃশ্য। কিছুদুর পর পরই বনের মধ্যে শালপাতা কুড়াতেদেখা যায় আদিবাসী নারীদের। আদিবাসীরা এই শালপাতা দিয়ে তৈরি করে হাড়িয়াখাওয়ার চোঙ্গা। এছাড়া তাদের অতি প্রিয় পাতার বিড়ি।

মিরাবনের পাশে আর একটি বন রয়েছে- ভটিয়া বন। গহিন এই বনে একটি গাছের পূজাকরে আশপাশের আদিবাসীরা। গাছটির নাম করমা। ভটিয়া বনের মাঝে চলতে চলতে হয়তোহঠাৎ বনের মধ্যে পেয়ে যেতে পারেন ঢোলের শব্দ। এভাবে আদিবাসীরা তীর ধনুকনিয়ে বিশেষ ভঙ্গিতে শিকার করছে।

রাতের শালবন আরও সুন্দর। আর যে রাত যদি হয় চান্নিপসর রাত তবে তো কথাইনেই। পূর্নিমা মাথায় রেখে এখানে বেড়াতে যাওয়াই উত্তম। ঝিঁঝিঁ পোকার ডাকাডাকি আর পেঁচার হুতুম শব্দে আপনি পেতে পারেন এডভেঞ্চারের স্বাদ।