কমলাপুর-রেলওয়ে-স্টেশন

কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় রেলওয়ে স্টেশন এবং বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ও বিখ্যাত একটি রেলওয়ে স্টেশন। একে বাংলাদেশের রেলওয়ে হেডকোয়ার্টারও বলা যেতে পারে। এটি ঢাকার মতিঝিলের কাছে কমলাপুরে অবস্থিত। কমলাপুর স্টেশন একটি বিশাল অঞ্চল নিয়ে অবস্থিত। এই বিশাল এলাকার মধ্যে মূল স্টেশন যার মধ্যে দশটি প্লাটফর্ম রয়েছে। রয়েছে রেস্টুরেন্ট, বইয়ের দোকান, টিকিট কাউন্টার, ভিআইপি লাউঞ্জ, যাত্রীদের জন্য বিশ্রামাগার, চাইনিজ রেস্টুরেন্ট, বাগান, নার্সারি, লোকোশেড, পোস্ট অফিস, গুদামঘর, মালঘর, হোটেল, কর্মচারি ও কর্মকর্তাদের বাসভবন, হাসপাতাল, রেলওয়ে স্টাফ কোয়ার্টার, খেলার মাঠ, অতিথিদের জন্য বাংলো, গাড়ি পার্কিং, ফুট ওভারব্রিজ, আমদানি রপ্তানি পণ্যের জন্য বিশাল এলাকা, ইঞ্জিন মেরামতের কারখানা, ক্যান্টিন, মসজিদ ও আরো অনেক কিছু।

কমলাপুর স্টেশনের নারায়নগঞ্জ প্লাটফর্ম এশিয়ার সবচেয়ে দীর্ঘ প্লাটফর্ম যা প্রায় ২ কিলোমিটার লম্বা। বলা হয়ে থাকে ভারতের খড়গপুর স্টেশনের প্লাটফর্ম সবচেয়ে দীর্ঘ প্লাটফর্ম যা ১.৩ কিলোমিটার কিন্তু কমলাপুর স্টেশন এদিক দিয়ে খড়গপুর স্টেশনকে ছারিয়ে গেছে।

এই স্টেশন থেকে বাংলাদেশের প্রতিটি জেলায় আন্তনগর ট্রেন রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে এই ট্রেন বিভিন্ন রুটে চলাচল করে।

এক সময় গুলিস্থানের ফুলবাড়িয়ায় ছিল ঢাকার একমাত্র রেলওয়ে স্টেশন। ভারত বিভক্তির পর ঢাকা হয়ে ওঠে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গুরুত্বপূর্ণ রাজধানী শহর। ফুলবাড়িয়ায় অবস্থিত রেল স্টেশনটির কলেবর বাড়ানোর প্রয়োজন দেখা দিলে অন্য জায়গায় এর স্থানান্তরের চিন্তা শুরু হয়। স্থানান্তরের স্থান নির্ধারণ করা হয় বর্তমান কমলাপুরে।

এক সময় এখানে বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে ছিল শুধু ধানক্ষেত। ষাটের দশকের শুরুর দিকে নির্মাণ করা হয় এই স্টেশন্টি।সে সময় এত বড় স্থাপনা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের আর কোথাও ছিল না। এত বড় নির্মাণ কান্ড দেখে মানুষ অবাক হতো। এর নির্মাণশৈলীও মানুষের নয়ন জুড়াত। তখন এর পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতার বিষয়ে খুব নজরদারি ছিল। কিন্তু কালের আবর্তে সাধারণ মানুষের কাছে যেমন এর আকর্ষণ কমতে থাকে, শ্রীহীন হতে থাকে এর পরিবেশও। কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনের যেন ক্ষণিকের জন্যেও বিশ্রাম নেই। যাত্রীদের ডাকডাকি আর হকারদের হাঁকাহাঁকিতে দিনরাত সরব থাকে। ট্রেনের হুইসেল আর ইঞ্জিনের ঝকমকে শব্দে শুরু হয় দিনের সকাল। মাইকে ঘোষণা দেয়া হচ্ছে অমুক গন্তব্যের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাবে ট্রেন আর তখনি শুরু হয় যাত্রীদের ট্রেনে উঠার তাড়াহুড়ো।

এই স্টেশন থেকে দৈনিক ৫০টি ট্রেন দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে ছেড়ে যায়। তেমনি ৫০টি ট্রেন এখানে এসে পৌছায়। দিনের বেলায় যেমন সরব রাতের বেলায়ও আল জ্বেলে যাত্রীদের নিয়ে সজাগ থাকে এ স্টেশন। যাত্রীদের সেবাদানের জন্য কমলাপুর স্টেশনে শতাধিক এবং বিভিন্ন বিভাগে বহুসংখ্যক কর্মচারি কর্মরত। এরপরও নানা সমস্যায় জর্জরিত কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন। যাত্রী বেড়েছে বহুগুণ।

কমলাপুর স্টেশনের বর্ত্মান জায়গাটি ছিল এক সময় বিস্তীর্ণ ধানক্ষেত। লোকজনের বসবাস ছিল না। রেল স্টেশন গড়ে তোলার পর এলাকায় আবাসিক এবং বাণিজ্যিক কদর বেড়ে যায়। নিচু জমি ভরাট করে মানুষ গড়ে তুলতে থাকে বসতি। পূর্ব দিকের মানুষ মতিঝিল আসা-যাওয়া করে এ রেল লাইনের ওপর দিয়ে। রেল রাস্তা পারাপারের দুর্ঘটনা এড়ানোর জন্য রেল লাইনের ওপর ঘড়ে তোলা হয় ওভারব্রিজ। বাংলাদেশের এটাই সর্ববৃহৎ রেল ওভারব্রিজ। তবে সেই অভারব্রিজের সৌন্দর্য আর নেই। বর্তমানে বর্ধিত আকারে রিমডেলিংয়ের কাজ চলছে।

বর্তমানে রেলওয়ে স্টেশনে চলছে আধুনিকায়নের জন্য সংস্কার কাজ। ঝকঝকে করার চেষ্টা থাকলেও সব সময় তা করা সম্ভব হয়ে উঠে না। শহরতলীর স্টেশনটির অবস্থা নাজুক। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত বেশ কয়েকটি গাড়ি নারায়ণগঞ্জ অভিমুখে যায় এবং নারায়ণগঞ্জ থেকে ফিরে আসে।

রেল পথের চলাচল দেশের নির্দিষ্ট জায়গাগুলতেই সীমিত থাকে। কিন্তু সড়কপথে যে কোন জাইগায় যে কোন সময়ে যাওয়া যায়। তারপরও সহজ স্বাচ্ছন্দ্য ও আরামদায়ক নিরাপদ ভ্রমণের জন্য রেলওয়ের কোন বিকল্প নেই। যারা একটু নিরাপদ ভ্রমণ করতে চান তাদের প্রিয় বাহন ট্রেন। কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন তার নিজস্ব ঐতিহ্য ও স্বকীয়তা রক্ষা করে চলছে। বাংলাদেশের দর্শনীয় স্থানসমূহের মধ্যে অন্যতম কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন। এই স্টেশনে ভ্রমণ করতে টিকিট লাগেনা বা এখানে অবস্থানের বিষয়ে কোন সময় বিষয়ক নিষেধাজ্ঞা নেই।