fir

এজাহার বা এফআইআর করতে হলে যা যা জানা প্রয়োজন

  •  Articles প্রবন্ধ
  • Comments Off on এজাহার বা এফআইআর করতে হলে যা যা জানা প্রয়োজন

আমাদের দৈনন্দিন জীবনে নানা কারণে এই বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন। কিন্তু বর্তমানে বিষয়টি অনেকেই ভালোভাবে না জানার বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে । বেশ কয়েক দিন আগে আমার গ্রামের এক বন্ধু কে প্রতিপক্ষ হত্যার উদ্দেশে রাস্তায় আক্রমণ করে । ভাগ্য ভালো আশেপাশের মানুষ এগিয়ে আসলে বেশ আহত অবস্থায় বেচে যায় । আমি খবর পেয়ে ফোন দিলাম । সে অচেতন থাকায় তার ছোট ভাই রিসিভ করল আর জানতে চাইলো কি করবে এখন । আমি বললাম থানায় গিয়ে আক্রমণকারীদের নাম ঠিকানা নিয়ে ঘটনার পূর্ণ বিবরণ সহ একটা এজহার দায়ের করতে । কিন্তু সে জানেনা কিভাবে তা করতে হয় বা তার কি করা উচিৎ থানায় গিয়ে । এরকম অবস্থার স্বীকার হয়ে থাকেন অনেকেই । পারিবারিক সহিংসতার পাশাপাশি রাজনৈতিক সহিংসতাও বেড়ে গেছে বহুগুণ । বাড়িঘর–দোকান- ব্যবসা বাণিজ্য – নিজের জীবন সব কিছুই যে কোন মূহুর্তে দূর্ঘটনার তথা হামলা- আক্রমণের স্বীকার হচ্ছে দেশজুড়ে । ঘটনা যদি ঘটেই যায় এবং আপনি যদি আইনের আশ্রয় নিতে চান তাহলে আপনাকে সর্বপ্রথম যে কাজটি করতে হবে সেটা হলো “এজহার”। ফৌজদারি কার্যবিধিতে সুস্পষ্ট কোন বিধান এই সম্পর্কে না থাকলেও ১৫৪; ১৬৭; ১৯০; ২০০ ধারা সমূহ বিশ্লেসন করে নিম্নোক্ত তথ্য পাই; * এফআইআর বা এজহার কি ? সহজ কথায়, অপরাধ বা অপরাধমূলক কোনো কিছু ঘটার পর সে বিষয়ে প্রতিকার পাওয়ার জন্য থানায় যে সংবাদ দেওয়া বা জানানো হয়, তাকে এজাহার বা এফআইআর (ফার্স্ট ইনফরমেশন রিপোর্ট) বলে। প্রকৃতপক্ষে, এজাহারের মাধ্যমে থানায় মামলা করা হয়। কারণ রাস্ট্র পক্ষের যে কোন মামলার আইনি প্রক্রিয়ার শুরু হয় এই এজহারের মাধ্যমে । অর্থাৎ যে কোন মামলার প্রথম ধাপ হল এই এজহার। মূলত, এজহারের দায়েরের উদ্দেশ্য হল ফৌজদারি বিচার ব্যাবস্থাকে চালু করে দেয়া। আমলযোগ্য কোন অপরাধ সংগটনের তথ্য ও সাক্ষ্য সংগ্রহের প্রাথমিক উৎস এবং সেই সূত্র ধরেই তদন্তকারী অপরাধীকে গ্রেপ্তারসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় কার্যবলী গ্রহন করা। সাক্ষ্য ,আলামত অপরাধ প্রমান, ঘটনা, ইতাদি নস্ট, কলুষিত, হারানোর আগেই তখা ঘটনা সংগটনের পরপরই এজহার দায়ের করা হয় বলে পরবর্তীকালে আদালত বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনায় অপরাধ সংগটনের সর্বোৎকৃষ্ট এবং সর্বপ্রথম উৎস হিসেবে বিবেচিত হয়। * এজাহার কে করতে পারে ? √ ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি নিজে; √ তাঁর পরিবারের সদস্য ; √ অন্য কোনো ব্যক্তি, যিনি ঘটনা ঘটতে দেখেছেন; √ যে কোন ব্যাক্তি,যিনি ঘটনা সম্পর্কে অবগত আছেন। √ ভারপ্রাপ্ত পুলিশ অফিসার, যিনি ঘটনা সম্পর্কে জেনেছেন √ কোর্ট এর আদেশক্রমে * আবেদন কোথায় করতে হবে? আবেদনটি দাখিল করতে হবে নিকটস্ত থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার অথবা ওসি র নিকট । * এজাহার দেওয়ার পদ্ধতি কি ? এজাহার লিখিত ও মৌখিক দুই ভাবে দেওয়া যায় । তবে লিখিত দেওয়াটাই ভালো । ঘটনার পূর্ণ বিবরণ, ঘটনার স্থান, সময় ,কীভাবে ঘটনা ঘটল, কেন ঘটল, দায়ী ব্যক্তি তথা আসামির নাম ঠিকানা জানা থাকলে তার পূর্ণ বিবরণ স্পষ্টভাবে লিখতে হবে । অর্থাৎ একটি পূর্ণাঙ্গ এজাহারের এ নিম্নোক্ত বিষয়গুলো যেন বাদ না পড়ে,  (১) অপরাধীর নাম ও ঠিকানা (জানা থাকলে) সুস্পষ্ট হওয়া; (২) অপরাধ সংঘ্টনের তারিখ ও সময় উল্লেখ করা; (৩) অপরাধের বর্ণনা যৌক্তিকভাবে লিপিবদ্ধ করা; (৪) অপরাধ সংগটনের স্থান সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা; (৫) অপরাধ সংঘটনের কোন পূর্ব সূত্র বা কারণ থেকে থাকলে তার বর্ণনা তুলে ধরা; (৬) সন্ধিগ্ধ ব্যক্তিদের সম্পর্কে ধারণা দেয়া; (৭) অপরাধ পরবর্তী অবস্থা যেমন সাক্ষীদের আগমন, আহত ব্যক্তির চিকিত্সা ইত্যাদি সম্পর্কে বর্ণনা; (৮) অপরাধীদের কেহ বাঁধা দিয়ে থাকলে তার ধারাবাহিক বর্ণনা করা; (৯) কোন বিষয় তাত্ক্ষনিক ভাবে লেখা সম্ভব না হলে পরবর্তীতে সে বিষয়টি সংযোজন করা হবে এমন একটি কৈফিয়ত এজাহারে রাখা৷ এজাহারকারীর পূর্ণ ঠিকানা ও সই থাকতে হবে, যদি লিখিত বা কম্পোজ আকারে দেওয়া হয় । আর যদি মৌখিকভাবে থানায় এজাহার দেওয়া হয়,তাহলে এজহারকারীর বক্তব্য থানার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা সঠিকভাবে লিখবেন। লিখিত আকারে নিয়ে এজাহারকারীকে তা পড়ে শোনাবেন । তারপর অভিযোগকারীর স্বাক্ষর নিবে। এবং যে কর্মকর্তা এজাহার লিখবেন, তিনিও সিল ও সই দেবেন। একটা বিষয় খেয়াল রাখা উচিত যে, কখনো এজাহার করতে যেন দেরি না হয়। অনেক সময় মামলার গ্রহণ যোগ্যতা হারিয়ে ফেলে । কারণ দেরিতে এজাহার করলে মামলার গুণাগুণ নষ্ট করতে পারে। যার ফলে অভিযোগকারী ন্যায়বিচার না পাওয়ার সম্ভবনা বাড়ে। যদি কোনো কারণে এজাহার করতে দেরি হয়েই যায় তাহলে তার সুনির্দিষ্ট কারণসহ আবেদনে উল্লেখ করতে হবে। এজাহারে কোন ঘষা- মাজা, কাটা- কাটি করা উচিত না এবং কোন প্রকারের ভুল তথ্য না দেওয়া। যা পরবর্তীতে মামলা পরিচালনা সমস্যা সৃষ্টি করে। এজাহার দায়ের করতে কোন টাকা বা ফিস লাগেনা। * পুলিশ কি করবে ? ১৫৬ ধারা মতে, এজাহার করার পর যদি উল্লিখিত অপরাধ আমলযোগ্য কিংবা এমন কোনো ঘটনাসংক্রান্ত হয়, যা তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নিলে আসামিদের ধরা যাবে বা শনাক্ত করা যাবে, বা করা উচিত ,সে ক্ষেত্রে পুলিশ তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেবে বা ঘটনার তদন্ত করবে ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমতি ছাড়াই। ১৫৫ ধারা মতে, এজাহারে বর্ণিত অপরাধ বা বিষয়টি আমলযোগ্য না হয়, তবে পুলিশ এ- সংক্রান্ত প্রতিবেদন বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে দাখিল করবে। সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বা তদন্তের জন্য সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেটের কাছ থেকে অনুমতি নেবে । উভয় ক্ষেত্রে মামলার তদন্ত অফিসার বা ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক নিয়োজিত কোন ব্যক্তি নিম্মোক্ত ধাপগুলো সাধারণত পালন করে থাকেন ; (ক) ঘটনাস্থলে যাওয়া । (খ) মামলার ঘটনা এবং অবস্থা । ascertain করা বা অবগত হওয়া । (গ) সন্দেহভাজন অপরাধী বা অপরাধীদের বের করা এবং গ্রেপ্তার করা । (ঘ) অভিযুক্ত অপরাধ সম্পর্কে প্রয়োজনীয় সাক্ষ্য প্রমাণাদি সংগ্রহ করা । যেমন :- সংশ্লিস্ট ব্যক্তিসহ অন্যান্য ব্যক্তিবর্গের বিবৃতি নেয়া ও জিগ্গাসাবাদ করা ; জব্দ তালিকা তৈরি করা ; case ডায়েরি তৈরি করা ; ১৭৩ ধারা অনুযায়ী চার্জশিট তৈরির ব্যবস্থা করা । * পুলিশ এজহার গ্রহন না করলে করণীয় ; ফৌজদারি কার্যবিধি ১৫৪(১) উপধারা অনুযায়ী থানায় এজহার দায়ের হলে তা গ্রহন করতে থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বাধ্য এবং যদি এজহার গ্রহণ করতে আস্বীকার করে তাহলে পুলিশ সুপারিন্টেনডেন্ট এর নিকট অভিযোগ দায়ের করতে পারেন। পুলিশ প্রবিধান আইনের ৪২ ধারায় কর্তব্য অবহেলার জন্য শাস্তির পরিমাণ সর্বোচ্চ তিন মাস কারাদণ্ড বলা আছে। যদি থানায় কোনভাবেই গ্রহণ না করে তাহলে সংশ্লিষ্ট এখতিয়ার ভুক্ত ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে যথাযথ প্রক্রিয়ায় অভিযোগ দেওয়া যায়। অভিযোগ সহ অভিযোগকারী আদালতে উপস্থিত হলে ম্যাজিস্ট্রেট ২০০ এবং ১৫৫ ধারার অধীনে অভিযোগকারীকে শপথের মাধ্যমে পরীক্ষা করে সন্তোষ্ট হলে বিষয়টা তদন্তের জন্য আদেশ দিতে পারেন আবার ভিত্তিহীন বলে আবেদন বাতিল করে দিতে পারেন।

Comments are closed.